Header Ads

Header ADS

ব্রান্ডিং

 ব্রান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ তবে সবক্ষেত্রে নয়। যখন কেউ খাবার খান তখন খাবারের ভাল মানের ব্যাপারে তিনি সচেতন থাকেন। শিশু খাদ্য আরো বেশি সেন্সিটিভ। আর এজন্য এই ধরনের পণ্যে ব্রান্ডিং এক প্রকার আস্থা ও নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে। আবার কিছু পণ্য আছে যেখানে ব্রান্ডিং এর প্রয়োজন পড়ে না। এই ধরেন কাঠের কাজ করবার জন্য কিছু পেরেক দরকার। এখন যদি পেরেক ব্যাবসায়ী তার পণ্যের ব্রান্ডিং এর জন্য বেশ ব্যয় করে তবে সেটার রিটার্ন খুব বেশি আসবার কথা নয়। এই ধরনের পন্যের জন্য ব্রান্ড এওয়ারনেসের প্রয়োজন পড়ে না।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিস্কার করি। কিছুদিন আগে দরজার তালা ও লকের দোকানে গিয়েছিলাম। কোন কোম্পানির লক এগুলা মূখ্য না হলেও এক্ষেত্রে কোন দেশের তৈরি একটা ভাল ব্রান্ডিং এর স্থান করে নিয়েছে।
কোন কিছু নিয়ে অবসেসড হতে নেই। ব্রান্ডিং এর প্রয়োজন যেমন আছে তেমনি ব্রান্ডিং ছাড়া পণ্যের ও বিশাল বাজার আছে যেখানে ব্রান্ডিং এর মূল্য খুব বেশি নয়। ব্যাবসার ক্ষেত্রে পণ্যের ব্রান্ডিং হতে পারে। হতে পারে ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের ব্রান্ডিং। নেসলের অনেক পণ্য আছে। যেসব পণ্যের নাম স্বতন্ত্র ব্রান্ডিং ভ্যালু সৃষ্টি করতে পেরেছে সেক্ষেত্রে বিজনেস ব্রান্ডিং এর পরিবর্তে প্রোডাক্ট ব্রান্ডিং বেশি মূখ্য হয়। কিটক্যাট কিনতে গেলে এটা নেসলের কিনা এই ধারনার পরিবর্তে কিটক্যাট শব্দটা নিজেই একটা আলাদা আস্থার স্থান তৈরি করে নিয়েছে। তবে বাজারে নতুন কোন পণ্য লঞ্চ করতে গেলে সেক্ষেত্রে বিজনেস ব্রান্ডিং ভাল ভূমিকা রাখে।
আবার কোন পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে কান্ট্রি ব্রান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মেডিকেল অনেক ইকুইপমেন্ট আছে যেগুলার কোম্পানির নাম উচ্চারন করা কঠিন। দোকানদার শুধু বলে যে এটি জার্মানির। এরপর একটা আস্থার সৃষ্টি হয়। মেড ইন জাপান শব্দটাও আমাদের দেশে অনুরূপ আস্থা সৃষ্টি করেছে। আর এজন্যই জাপানি পণ্য কেনার আগে মান নিয়ে সিদ্ধান্থীনতার প্রতিবন্ধকতা কম।
আমি সত্যিই জানতাম না Miniso চাইনিজ ব্রান্ড। আমি জাপানিজ ব্রান্ড হিসাবেই জেনে এসেছি। চাইনিজ কোম্পানিটি নিজেদেরকে জাপানি হিসাবে পরোক্ষভাবে ব্রান্ডিং করে আসছে। এক্ষেত্রে জাপানিস কার্টুন ক্যারেকটারের ডল বা এজাতীয় কিছু একটাকে তারা ফোকাস করেছিল। (এরকম খবরি পড়েছিলাম যতদূর মনে পড়ে)
আমাদের দেশের একটি কোম্পানির কথা বলি। আমি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হবার আগ পর্যন্ত যানতাম Miyako জাপানিজ কোম্পানি। তাদের ওভেন, ইন্ডাকশন ও অন্যান্য ইলেক্ট্রিক আইটেম গুলি উচ্চ মানের। দেশীয় কোম্পানি হলেও নামটা শুধু জাপানিজ শব্দ। কোম্পানিটির বাজার সুনাম অনেক ভাল। অবাক হয়েছি এটা জেনে যে, মিয়াকো কোম্পানি বিজ্ঞাপনের পেছনে কোন টাকা ব্যয় করেনা। বিজ্ঞাপন খরচে টাকা না ঢেলে কোম্পানিটি শুধুমাত্র উচ্চ মানের পণ্যের দিকে নজর দিয়েছে। তাহলে বিজ্ঞাপন ছাড়া মিয়াকোর এত বড় বাজার হল কি করে? আমার ধারনা এর পেছনের কারন মিনিসোর মত জাপানের সুনামের পরোক্ষ ব্যাবহার। সেই সাথে উচ্চমান পণ্য আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি করেনি।
আমি অনেক বড়লোক। অন্তত চা খাওয়ার ক্ষেত্রে। রিকশা ভাড়া বাচিয়ে হেটে অফিস করলেও একটা শখ হল চা খাওয়া। এক্ষেত্রে আমার ফেভারিট ব্রান্ড হল....."আর্ল গ্রে" যেটা আসলে একটি ফ্লেভার। আসলে কোম্পানির নাম এখানে মূখ্য নয়। চায়ের বাজার আগের মত নেই। এখন ফ্লেভারড টি, হেলথ বেনিফিট, চা পাতা তুলার সময় অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে প্রিমিয়াম চা ক্যাটাগরির বাজার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই যে বাজার সেগমেন্টেশন এর একটা ইমপ্লিকেশন আছে। ভ্যালু এড করা ও নতুন উউদ্ভাবন এখানে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এক কেজি সাধারন চা এর মুল্য যেটা এক কেজি চা কে বেটার ব্রান্ডিং করে এর ১০০ গুন দামেও বিক্রি সম্ভব।
শ্রীলংকাকে যত মানুষ বিশ্বে চেনে তার থেকে বেশি চেনে সিলন টি কে। বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ বিখ্যাত চা কোম্পানির প্রিমিয়াম ক্যাটাগরিতে পিউর সিলন ব্লাক টি উইথ ফ্লেভার হিসাবে বার্গামুট (আর্ল গ্রে), জেসমিন ফুল, স্যাফরন (জাফরান), ফ্রুটস ইত্যাদি যুক্ত করে। আবার ব্লাক টি ছাড়াও দামি অনেক চা আছে। শ্রীলংকা ছোট দেশ। অথচ দেশটির অর্থনীতির অন্যতম শক্তি ছিল চা খাত। ডিলমার মত শ্রীলংকায় অনেক বিখ্যাত কোম্পানি আছে যার উপস্থিতি নেই এমন কোন দেশ নেই। একারনে শ্রীলঙ্কার চা বাগানে মজুরি নিয়ে এত হা হুতাস নেই।
ভারতের কিছু কোম্পানি সম্প্রতি প্রিমিয়াম চা সেগমেন্টে বেশ ভাল অবস্থান করে নিয়েছে। তাদের ব্রান্ডিং এত ভাল যে টোয়াইনিং এর আসম, মিজোরাম চাও দেখেছি।
কেনিয়ার কারিচো কোম্পানির চা এর ব্রান্ডিং দেখে আমি অবাক। প্রায় ৫০ রকমের সম্পূর্ণ আলাদা কারিচো ব্রান্ডের চা দেখেছি।
বাংলাদেশ এখনো সম্ভাবনাগুলি কাজে লাগানোর বিচারে পিছিয়ে। আমাদের দেশে চা এর অর্থ হল আগে ছিল লুজ ব্লাক টি। এখন বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটে ব্লাক টি। অথচ চাইলে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলি খুব ভাল ভাবে ভ্যালু এডিশন করতে পারত। কাজি এন কাজি টি এর ক্ষেত্রে এরকম প্রয়াস দেখেছি। তবে সেগুলা মাসালা, জিনজার, গ্রিন টি এসবের বাইরে যেতে পারেনি।
এক্ষেত্রে প্যাকেজিং ব্রান্ডিং সবকিছুতে মন কাড়ার মত দেশীয় কোম্পানি মনে হয়েছে হালদা ভ্যালি। এদেশে অনেকেই হয়ত এখনো তাদের উৎপাদিত ভ্যারাইটির সাথে পরিচিত নয়। তবে রপ্তানি বাজারে তারা ভাল করবে। কিন্তু আক্ষেপ হল, বাংলাদেশের অর্থনীতির বিশাল একটা খাত ছিল চা। আগে পাঠ্যবইতে পড়তাম সোনালী আঁশ পাট, ও অর্থকরী ফসল চা। বাংলাদেশ তখন বিশ্বের শীর্ষ চা উৎপাদক দেশগুলির একটি ছিল। এখন আমদানিকারক দেশে পরিনত হয়েছে। উৎপাদন মানে কেজিতে নয়। যদি ব্রান্ডিং ও ভাল ভাবে করা যেত তবে এদেশের চা হতে আয় অনেক বৃদ্ধি পাবার সুযোগ ছিল। অথচ পরিকল্পনার অভাব, দূরদৃষ্টির অভাব, কোম্পানিগুলিকে প্লাস্টিকের পটেটো চিপসের মত প্যাকেটে ভরে প্রিমিয়াম নাম লিখে দিয়ে চলছে। এসব কোম্পানির মুনাফার বেশ বড় উৎস দাসদের থেকে। দাস বলছি এজন্য যে, ১৭০ টাকা দৈনিক মজুরি এটা প্রতি দিনে $১.৫ ডলারের কম। আন্তর্জাতিক সকল মানদন্ডে এটা হতদরিদ্রের থ্রেশোল্ডেই পড়বে। এক্ষেত্রে কোন যুক্তি অবকাশ নেই।
আমাদের চা গবেষনাগার আছে। নিলামের বাজার আছে। ১৬ কোটি টাকা কেজির গোল্ডেন বেঙ্গল চা আমরা আবিস্কার করেছি যা বিশ্বের সবথেকে দামি। শুধুমাত্র নেই বাজারজার করা ও প্রোমশনের জন্য পণ্য বৈচিত্র, ভোক্তার চাহিদা উপলব্দি।
সস্তা শ্রমের ব্রান্ডিং ক্ষতিকর। এর কারন হল এটা কান্ট্রি ব্রান্ডিং কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর প্রভাব পড়তে পারে প্রতিটি রপ্তানি পণ্যের উপর পরোক্ষ ভাবে। যেমন এক সময় সাধারন ধারনা ছিল "মেড ইন চায়না, বেশিদিন যায়না"। চীন তাদের পণ্যের মান উন্নত করে এমন অবস্থানে পৌছেছে যে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই মানুষের হাতে চাইনিজ ব্রান্ডের মুঠোফোন। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হয়। যারা ভ্যাজাল দেয়, খারাপ গুনগতমানের পণ্য বিক্রি করে এসব প্রতিষ্ঠনকে ব্যাবসার সুযোগ দিলেও সামগ্রিকভাবে ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি হয়। আর যারা সৎ ব্যাবসায়ী তাদেরকে প্রয়োজনে পলিসি সাপোর্ট দিয়ে হলেও গ্লোবাল প্লেয়ারে পরিনত করানো উচিত।
কোম্পানির উন্নতি নির্ভর করে কর্মীদের উপর। কর্মীদের রিজিক ন্যায্য ভাবে নিশ্চিত না করে সেটা করা যায় না। উচ্চ বেতন নিশ্চিতের বাড়তি খরচ খুব সহজেই বিভিন্ন ভ্যালু এডিশনের মাধ্যমে উসুল সম্ভব। বেতন খরচ হিসাবে বিবেচনা না করে বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করা উচিত।
আশাকরি আমাদের সব সেক্টরে একসময় সুস্থ চিন্তাধারা চর্চা হবে।
লেখাটা অন্য টপিক মাথায় নিয়ে শুরু করলেও ভুলে গেছি কি ছিল সেটা। 🙄
লেখা: আগষ্ট ২৮, ২০২২

No comments

Powered by Blogger.